আজ ১৬ শ্রাবণ ১৪২৮, শনিবার ৩১ জুলাই ২০২১ , ১:৫২ অপরাহ্ণ
ব্রেকিং নিউজ
সর্বশেষ খবর
নারায়ণগঞ্জবাসীকে ঈদুল ফিতরের আগাম শুভেচ্ছা জানালেন সজল বিন ইবু রূপগঞ্জ উপজেলায় সকল মার্কেট বন্ধের নির্দেশ সোনারগাঁয়ে সকল বিপনি বিতান বন্ধ করে দিলেন প্রশাসন না’গঞ্জের সাবেক সেই এসপি হারুন এবার ডিএমপির উপ-কমিশানর করোনা: শরীফুল হকের পক্ষে সবাইকে সচেতন থাকার আহ্বান জানালেন শাওন

মিল-ফ্যাক্টরী খোলায় প্রাণচাঞ্চল্য ফিরলেও বাড়ছে আতঙ্ক !


২৯ এপ্রিল ২০২০ বুধবার, ১২:২১  পিএম

সময় নারায়ণগঞ্জ


মিল-ফ্যাক্টরী খোলায় প্রাণচাঞ্চল্য ফিরলেও বাড়ছে আতঙ্ক !

তুষার আহমেদ : গত ৮ মার্চ থেকে ২৮ এপ্রিল। এই দীর্ঘ ৫০ দিনে মহামারি করোনায় স্থবির হয়ে পড়েছে নারায়ণগঞ্জ। রাজধানী ঢাকার পর সবচেয়ে ভয়াবহ পরিস্থিতি বিরাজ করেছে নারায়ণগঞ্জে। সবশেষ গত ২৮ এপ্রিলেও নারায়ণগঞ্জে নতুন সনাক্ত হয়েছে ১৫০ জন রোগী। এ নিয়ে জেলায় ইতিমধ্যে আক্রান্তের সংখ্যা দাঁড়ালো ৮৪৯ জনে। জেলা সিভিল সার্জনের সবশেষ তথ্য অনুযায়ী নারায়ণগঞ্জে মৃত্যু বরণ করেছেন ৪২ জন নারী-পুরুষ।

গত ২৬ মার্চ থেকে করোনার সংক্রোমন বৃদ্ধি পেতে শুরু করে। ৩০ মার্চ বন্দর উপজেলার রসুলবাগ এলাকায় এক করোনা আক্রান্ত নারীর মৃত্যুর পর নড়েচরে বসেন জেলা প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। আইইডিসিআর থেকেও নারায়ণগঞ্জ নিয়ে সতর্ক করা হয় বারংবার। ‘হটস্পট’ ও ‘রেড জোন’ হিসেবে আখ্যায়ীত করা হয় নারায়ণগঞ্জ’কে। হু হু করে বাড়তে থাকে আক্রান্তের সংখ্যা। পর্যায়ক্রমে গোটা জেলাকে লকডাউন ঘোষণা করেন আইএসপিআর। এর মধ্যদিয়ে দেশে প্রথম জেলা হিসেবে লকডাউনের আওতায় চলে আসে নারায়ণগঞ্জ।

অনুসন্ধানে দেখা গেছে, গত ২৬ মার্চ থেকে দেশে সাধারণ ছুটি ঘোষণা করেন সরকার। সেই থেকে পাঁচ দফা বাড়িয়ে সবশেষ আগামী ৫ই মে পর্যন্ত ছুটির ঘোষণা আসে। ফলে হঠাৎ লকডাউন ও ছুটির ঘোষণায় বন্ধ হয়ে যায় শিল্পনগরী নারায়ণগঞ্জের শিল্প প্রতিষ্ঠান গুলো। ছোট-বড় হোসিয়ারীসহ কল-কারখানা সবই ছিলো বন্ধের তালিকায়। বাদ যায়নি ফুটপাতের ক্ষুদ্র ব্যবসা প্রতিষ্ঠানও। এতে করে কর্মহীন হয়ে পড়ে জেলার লাখো মানুষ। এছাড়াও মুদিসহ অন্যান্য নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যদ্রব্য ও বাজার ঘাটও দিনের নির্দিষ্ট সময় দুপুরের মধ্যে বন্ধ করতে হয়েছে দোকানীদের। নারায়ণগঞ্জের এমন পরিস্থিতিতে ভাসমান বহু শ্রমিকরা বিভিন্ন কৌশলে চলে গিয়েছেন নিজ গ্রামের বাড়ি। চরম সংকটে দিনাতিপাতের মধ্যেই চলে এসেছে পবিত্র মাহে রমজান। এতে করে রোজার প্রয়োজনীয় বাজারের অভাবে শঙ্কায় দিন কাটতে থাকে কর্মহীন মানুষদের। জেলায় চড়ম অর্থনৈতিক সংকট দেখা দেয়। মিল-ফ্যাক্টরী বন্ধ থাকায় বেকার জীবন-যাপন শুরু করে ঘরবন্দি থাকা পরিবারের কর্মক্ষম সদস্যরাও।

এমন পরিস্থিতিতে শিল্পনগরী নারায়ণগঞ্জ তথা দেশের অর্থনৈতিক চাঁকায় গতি ফেরাতে গত ২৬ এপ্রিল থেকে পোশাক কারখানাসহ অন্যান্য মিল-ফ্যাক্টরী খুলতে শুরু করে।

মঙ্গলবার (২৮ এপ্রিল) সকালে সরেজমিনে দেখা যায়, নারায়ণগঞ্জ সদর উপজেলার ফতুল্লার বিসিক শিল্পাঞ্চলসহ রেললাইন বটতলা, পাগলা, কুতুবপুর ও আশপাশের এলাকার পোশাক কারখানা এবং অন্যান্য মিল-ফ্যাক্টরী খোলা হয়েছে। আগামী ২মে থেকে সকল কারখানা চালু করা হবে।

এবিষয়ে বিকেএমইএর সিনিয়র সহ-সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেছেন- ‘২ তারিখ থেকে অন্যান্য কারখানা খোলা হবে। আপাতত নীটিং, ডাইং ও স্যাম্পল সেকশন চালু হবে। এই সেকশন গুলোতে লোকবল কম দরকার হয়।’ তিনি বলেন- ‘অর্থনৈতিক সংকট শুরু হওয়ায় এবং বায়ারদের অর্ডার হাত ছাড়া হওয়ার আশঙ্কায় ঝুকি নিয়েই কারখানা খোলা হচ্ছে। করোনা এখন আমাদের জীবনের অংশ। জীবিকার তাগিদে এর সাথে মোকাবেলা করেই আমাদের এগোতে হবে।’


তিনি বলেন- ‘করোনার ঝুঁকি থাকলেও সংক্রোমন এড়াতে আমরা ব্যবস্থা নিয়েছি। অল্প সংখ্যক শ্রমিক দিয়ে কাজ চালাচ্ছি। যাতে দুরত্ব বজায় থাকে। এছাড়া অন্যান্য সুরক্ষা ব্যবস্থাও রয়েছে। আর করোনার মধ্যে নারায়ণগঞ্জ ছেড়ে অন্যকোথাও গিয়েছেন এমন কোন শ্রমিকের তথ্য পেলে আপাতত তাকে আমরা নিচ্ছি না। তাদের কোয়ারেন্টাইনে থাকতে বলছি।’

এদিকে মিল-ফ্যাক্টরী খোলার সংবাদে নারায়ণগঞ্জ ত্যাগ করা শ্রমিকরা পূনরায় বিভিন্ন জেলা থেকে নারায়ণগঞ্জে প্রবেশ করতে শুরু করেছেন। এতে করে সড়কে সিএনজি, লেগুনা, টেম্পু ও অটোরিক্সা চলাচল তুলনা মূলক বেড়েছে। সড়ক গুলোতে যেন পূরনো ব্যস্ততা ফিরে আসতে শুরু করেছে। বিশেষ করে মঙ্গলবার ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ-মুন্সীগঞ্জ পুরাতন সড়কসহ ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ লিংক রোডে এসব যানবাহনের চলাচল ছিলো চোখে পড়ার মত।

এছাড়াও সড়কের কোথাও কোথাও পুলিশ অবস্থান করলেও বিগত দিনের মত কঠোর ভূমিকায় দেখা যায়নি তাদের। কোন যান বাহন আটকের তথ্যও জানায়নি থানা সূত্র।
তাই সড়কে দুর-পাল্লার বাস চলাচল না করলেও চাকুরী বাঁচাতে দুরদুরান্ত থেকে পিকআপ, সিএনজি, টেম্পু, লেগুনা, রিক্সা, অটো-রিক্সার মত ছোট বাহনে করে ভেঙ্গে ভেঙ্গে নারায়ণগঞ্জে প্রবেশ করছে শ্রমজীবী মানুষেরা।

ফতুল্লার লিংক রোডে কথা হয় আলামিন নামে এক যুবকের সাথে। পেশায় তিনি গার্মেন্ট শ্রমিক। বিসিকের একটি গার্মেন্টসে চাকুরী করেন। করোনার প্রকোপের মধ্যেই চলে গিয়েছিলেন গ্রামের বাড়ি ময়মনসিংহে।

এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন- ‘এতোদিন গার্মেন্টস বন্ধ ছিলো। তাই নারায়ণগঞ্জ থেকে গ্রামের বাড়ি ময়মনসিংহে চলে গিয়েছিলাম। এখন গার্মেন্টস খুলেছে। তাই চলে এসেছি। রাস্তায় কোন বাস চলছে না। সিএনজি ও অটোরিক্সায় চড়ে এসেছি। রাস্তায় পুলিশ দেখেছি, কিন্তু বাধা দেয়নি।’
এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন- ‘আমাদের না এসে উপায় নেই। কাজে যোগ না দিলে চাকরি হারাতে হবে। আবার সামনে ঈদ চলে এসেছে। তাই ঝুঁকি নিয়ে হলেও আসতে বাদ্ধ হলাম। করোনার ভয়তো আছেই। ভয় নিয়েই সচেতনতার সাথে কাজ করতে হবে। কিছুই করার নেই।’

একই সময়ে কথা হয় জহুরা নামে এক মধ্য বয়স্কা নারীর সাথে। তিনি বলেন, ‘আমি ফতুল্লার সেহাচর এলাকায় ক্ষুদ্র পরিসরে টেইলার্স ও কাপড়ের ব্যবসা করি। নারায়ণগঞ্জে করোনা আতঙ্কে ছিলাম। দোকানপাটও খুলতে পারতাম না। তাই গত ২৬ মার্চ সরকারী ছুটি ঘোষণা করার সাথে সাথে শিশু নাতি মুহিনকে নিয়ে গ্রামের বাড়ি ঝিনাইদহ চলে যাই। দীর্ঘ একমাস বেড়ালাম। হাতে টাকা যা ছিলো সব খরচ হয়ে গেছে। সামনে ঈদ চলে এসেছে। এখন দোকান না খুলে উপায় নেই। তাই ঝুঁকি নিয়েই ঝুঁকিপূর্ন এলাকা নারায়ণগঞ্জে চলে এসেছি। বাস চলাচল বন্ধ। ভোরে সেহরী খেয়েই শিশু নাতিকে সাথে নিয়ে রিক্সা ও সিএনজি যোগে এসেছি। পুরো সড়ক ফাঁকা, কোথাও কোন যানজট নেই। আর রাস্তায় দেখলাম পুলিশও বাধা দেয়নি। তাই রিক্সা ও সিএনজিতে করেই মাত্র ৮ ঘন্টায় ঝিনাইদহ থেকে ফতুল্লায় চলে আসলাম। ভাবতেই অবাক লাগছে।’

এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘ভয়ে ভয়ে এসেছি। ভেবেছিলাম যে রাস্তায় পুলিশ বা সেনাবাহিনী বাধা দেবে। কিন্তু কেউ কোন বাধা দেয়নি বলেই আসতে পেরেছি। আর করোনার ভয়তো আছেই। শুনেছি নারায়ণগঞ্জের পরিস্থিতি ভয়াবহ। কিন্তু এভাবে আর কতদিন? দোকান না খুললেতো না খেয়ে মরতে হবে। আমাদেরতো কেউ ত্রাণ দিয়ে যাবে না।’

এদিকে সরেজমিনে দেখা গেছে, শহরে ইফতার সামগ্রীর বাহারী মেলা না বসলেও বিভিন্ন পাড়া মহল্লাগুলোতে ফুটে উঠেছে রমজান মাসের পুরনো চিত্র। এলাকার মোড়ে মোড়ে ইফতার সামগ্রীর পশরা সাজিয়ে বসেছেন দোকানিরা। অনেকে ভ্যানে করে বিক্রি করছেন। রোজার নিত্যপ্রয়োজনীয় খেজুরসহ ফলের দোকান সাজিয়ে বসেছেন অনেকে। এতে ক্রেতাদের সমাগমও রয়েছে বেশ। ভয়ের বিষয় হচ্ছে সামাজিক দুরত্বের বিধান তেমন ভাবে মানছেন না কেউ। মাক্স ব্যবহার করলেও পন্য ক্রয়ের হিড়িকে একে অন্যের সংস্পর্শে চলে যাচ্ছেন নিজের অজান্তেই।

তবে, শিল্প-কারখানা চালু হওয়ায় নারায়ণগঞ্জে আসতে শুরু করেছে অন্যান্য জেলার মানুষেরা। ফলে ধীরে ধীরে প্রাণচঞ্চল হয়ে উঠছে জেলার বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ন সড়ক। পাড়া-মহল্লার পাশাপাশি শহরের আশপাশেও মানুষের আনাগোনা বেড়েছে। এতে প্রাণচঞ্চল্যতা বাড়লেও আতঙ্ক কমছে না।

সময় নারায়নগঞ্জ.কম এ প্রকাশিত/প্রচারিত সংবাদ, তথ্য, ছবি, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট বিনা অনুমতিতে ব্যবহার বেআইনি।

আপনার মন্তব্য লিখুন:

শহরের বাইরে -এর সর্বশেষ