আজ ২৭ শ্রাবণ ১৪২৭, মঙ্গলবার ১১ আগস্ট ২০২০ , ৪:৪৬ অপরাহ্ণ
ব্রেকিং নিউজ
সর্বশেষ খবর
নারায়ণগঞ্জবাসীকে ঈদুল ফিতরের আগাম শুভেচ্ছা জানালেন সজল বিন ইবু রূপগঞ্জ উপজেলায় সকল মার্কেট বন্ধের নির্দেশ সোনারগাঁয়ে সকল বিপনি বিতান বন্ধ করে দিলেন প্রশাসন না’গঞ্জের সাবেক সেই এসপি হারুন এবার ডিএমপির উপ-কমিশানর করোনা: শরীফুল হকের পক্ষে সবাইকে সচেতন থাকার আহ্বান জানালেন শাওন

বাস-ট্রেন ও লঞ্চেই চলছে লকডাউন


১২ মে ২০২০ মঙ্গলবার, ১১:৪৮  এএম

সময় নারায়ণগঞ্জ


বাস-ট্রেন ও লঞ্চেই চলছে লকডাউন

তুষার আহমেদ : ‘করোনা’ ও ‘লকডাউন’। শব্দ দুটির সাথে অল্প দিনেই পরিচিত হয়ে উঠেছে নারায়ণগঞ্জের সব শ্রেনি-পেশার মানুষ। কিন্তু জীবিকার তাগিদে দিন রাত ছুটে বেড়ানো কর্মব্যস্ত এই জেলার মানুষদের কী থামাতে পেড়েছে বৈশি^ক মহামারি করোনা ? উত্তর- মোটেই না। কার্যত যতই দিন গড়াচ্ছে ততই যেন চুর্ন-বিচুর্ন হচ্ছে ‘লকডাউন’ নামক শব্দটি।

ভয়ের বিষয় হচ্ছে, লকডাউন কেবল শব্দে সীমাবদ্ধ থাকলেও ‘করোনা ঘাতক’ কিন্তু তার কাজ করে যাচ্ছে নিরবে! ফলে গোটা দেশের ন্যায় নারায়ণগঞ্জে বেড়ে চলেছে করোনার বিস্তার। আক্রান্তের দিক থেকে নিয়মিত রেকর্ড গড়তে থাকা এই ভাইরাসের সংক্রোমনের ঝুঁকি আরো ঘনিভুত হলেও জীবিকার তাগিদ যেন এই করোনাকেও হার মানিয়ে দিচ্ছে ক্ষণে ক্ষণে।

তাইতো প্রাণঘাতী করোনার প্রবল ঝুঁকি কাঁধে নিয়েই লকডাউন ভেঙ্গে জেলার মানুষ ছুটে বেড়াচ্ছে জীবিকার সন্ধানে। ফলে লকডাউনের বন্দিদশার আদেশ বহাল থাকলেও জীবিকার চাহিদা একটু একটু করে স্বাভাবিক করে তুলছে নারায়ণগঞ্জ’কে।

কেবল বাস, ট্রেন ও লঞ্চ। এই তিন পরিবহনেই লেগে আছে লকডাউন। এছাড়া ভিন্ন কোন খাতে লকডাউনের কঠোরতা নেই। সড়ক বা নদী পথে বাস-লঞ্চ ব্যতিত অন্যান্য যানবাহন চলাচলে কোন বাধা বিপত্তি নেই। ফলে সড়ক ও নদী পথের ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র যানবাহনে চড়েই কর্মস্থল নারায়ণগঞ্জে ছুটছে হাজারো মানুষ। যোগ দিচ্ছেন আপন কর্মস্থলে।

সূত্র বলছে, ক’দিন পরই চলে আসছে পবিত্র ঈদুল ফিতর। এই ঈদের ছুটিতে আবারও নাড়ির টানে বাড়ির পথ ধরবেন দুর-দুরান্ত থেকে নারায়ণগঞ্জে আসা লাখো মানুষ। দুর-পাল্লার বাস, ট্রেন বা লঞ্চ চলাচল শুরু না হলে হয়তো একই পন্থায় গাদাগাদি করে ক্ষুদ্র যানবাহনে চাপতে হবে মানুষদের। যেখানে মানা হবে না স্বাস্থ্য বিধির ছিটে-ফোটাও! ঝুঁকি নিয়ে এই আসা-যাওয়ার খেলায় করোনার সংক্রোমন বৃদ্ধি পাওয়ার সম্ভাবনা বেড়ে যাবে বহুগুণে।

এ প্রসঙ্গে ফতুল্লা জেনারেল হাসপাতালের চিকিৎসক ডাঃ মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, ‘শুরুতে লকডাউনের কড়াকড়ি ছিলো। পত্র-পত্রিকায় জানতে পেড়েছি যে, এই লকডাউনের মধ্যেই বহু মানুষ নিজ নিজ গ্রামের বাড়িতে গিয়েছেন। আর এখন মিল-ফ্যাক্টরী চালু হওয়ায় এই শ্রমজীবি মানুষ গুলোই বিভিন্ন পন্থায় আবার নারায়ণগঞ্জে ফিরছেন। অটো রিক্সা, ইজিবাইক, সিএনজি, পন্যবাহি ট্রাক, আবার নদী পথে ট্রলারে চড়েও একসাথে গাদাগাদি করে আসছেন। হয়তো সামনে ঈদের ছুটিতে আবারও এই পন্থায় বাড়ির পথ ধরবেন। ছুটি শেষে আবার ফিরবেনও। এর ফলে করোনা সংক্রোমণের ভয়াবহ বিস্তার ঘটার জোড়ালো সম্ভাবনা থেকে যাচ্ছে। এভাবে আসা যাওয়ায় প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্য বিধি মানা হয় না। এমনিতেই নারায়ণগঞ্জ করোনার হটস্পট বা রেড জোন। আর এই ঝুঁকিপূর্ন জায়গায় এভাবে স্বাস্থ্য বিধি ভঙ্গ করে আসা যাওয়া বৃদ্ধি পাওয়ায় এই জেলার পাশপাশি গোটা দেশেই করোনার সংক্রোমণ আরো বেশি ছড়িয়ে পড়ছে। এভাবে চলতে থাকলে আগামীতে করোনা আরো ভয়াবহ আকার ধারণ করবে।’

সোমবার (১১ মে) সরেজমিনে দেখা যায়, নারায়ণগঞ্জে সড়কে কোন বাস চলাচল না করলেও বেড়েছে রিক্সা, অটোরিক্সা, সিএনজি ও অন্যান্য ক্ষুদ্র যানবাহনের চলাচল। বিশেষ করে ইজিবাইক, সিএনজি, টেম্পু ও লেগুনায় একে অন্যের সাথে গাদাগাদি করে যাতায়াত করছেন। এতে কেউ স্বাস্থ্য বিধি মানছেন না। সড়কে দায়িত্বে থাকা পুলিশ ও ট্রাফিকও এসবে নজর দিচ্ছেন না।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক পুলিশ সদস্য বলেন, ‘এখন গার্মেন্টস, মিল-ফ্যাক্টরী চালু হয়েছে। শপিং কমপ্লেক্স খোলা হচ্ছে। মসজিদে জামাতে নামাজের অনুমতি মিলেছে। ঝুঁকির মধ্যেও সব স্বাভাবিক হয়ে উঠছে। তাই সড়কে মানুষের চলাচল বেড়েছে। পায়ে হেটে দুর-দুরান্তে কাজে যাওয়াতো সম্ভব নয়। তাই ক্ষুদ্র যানবাহন চলাচলে কোন বাধা দিচ্ছি না।’

ফতুল্লার পাগলা টু চাষাড়া সড়কে চলাচলকারী ইজিবাইক চালক হোসেন মিয়া জানান- ‘লকডাউনের শুরুতে বেশ কিছুদিন ইজিবাইক নিয়ে বের হতে পারিনি। পুলিশ বাধা দিচ্ছিল। তবে, মিল-ফ্যাক্টরী খোলার পর রোজার শুরু থেকে রাস্তায় মানুষের চলাচল বেড়েছে। আর ইজিবাইকসহ অন্যান্য গাড়ি চলাচলও আগের মতই স্বাভাবিক হয়ে উঠেছে। এখন গাড়ি চালিয়ে যা আয় হচ্ছে তাতে কোন সমস্য নেই। রাস্তায় ভরপুর যাত্রী পাচ্ছি। সমস্যা হচ্ছে না।’

তবে, এমন পরিস্থিতিতে ভালো নেই বাস মালিক, চালক ও শ্রমিকরা। জানা গেছে, লকডাউনেরও আগে গত ১৭ মার্চ থেকে দেশজুড়ে বাস-মিনিবাস চলাচল বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। এরপর থেকে কর্মহীন হয়ে পড়েছে এই পরিবহন শ্রমিকরা। নারায়ণগঞ্জেও একই চিত্র। নারায়ণগঞ্জে বিপুল সংখ্যক পরিবহন শ্রমিক কর্মহীন থাকলেও তাদের পাশে দাঁড়ায়নি কেউ। দীর্ঘ প্রায় ২ মাস কর্মহীন থাকার পর যেন ধর্য্যরে বাঁধ ভেঙ্গেছে পরিবহন শ্রমিকদের। ফলে ত্রাণ সহায়তার দাবীতে রাস্তায় নেমে আন্দোলনও করেছে কেউ কেউ।

গত রবিবার (১০ মে) দুপুর ২টায় নারায়ণগঞ্জের সিদ্ধিরগঞ্জ থানাধীন ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের দ্বিতীয় কাঁচপুর ব্রিজের পশ্চিম ঢালে মনজিল পরিবহনের দুই শতাধিক চালক-শ্রমিক প্রায় আধা ঘন্টা সড়কের যান চলাচল বন্ধ করে দিয়ে ত্রাণের দাবীতে বিক্ষোভ প্রদর্শন করে। খবর পেয়ে সিদ্ধিরগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) কামরুল ফারুক, কাঁচপুর হাইওয়ে থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোজাফ্ফর হোসেন ও সেনাবাহিনীর সদস্যরা ঘটনাস্থলে ছুটে এসে শ্রমিকদেরকে বুঝিয়ে রাস্তা থেকে সড়িয়ে দেয়।

সূত্র বলছে, এমন সংকটে শুধু মনজিল পরিবহনের শ্রমিকরাই নয়, গোটা নারায়ণগঞ্জ তথা দেশের পরিবহন চালক ও শ্রমিকদের মাঝে একই সংকট বিরাজ করছে।

এই বিষয়ে জানতে নারায়ণগঞ্জ-মুন্সীগঞ্জ বাস-মিনিবাস মালিক সমিতির সভাপতি মোক্তার হোসেন এর সাথে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাকে ফোনে পাওয়া যায়নি।

এদিকে স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার শর্তে সীমিত আকারে সারাদেশে গণপরিবহন চালু করার দাবি জানিয়েছে ‘যাত্রী অধিকার সংরক্ষণ পরিষদ’ নামের একটি সংগঠন। সোমবার (১১ মে) ১১টি সুপারিশ তুলে ধরে এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এই দাবি জানায় সংগঠনটি।

ওই বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, দিনমজুর, গৃহকর্মীসহ দৈনিক কাজের ওপর নির্ভরশীল মানুষ রাস্তায় বেরিয়ে পড়ছে। পোশাক কারখানাসহ বিভিন্ন উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান খুলে দেয়া হয়েছে। তবে গণপরিবহন বন্ধ থাকায় পোশাককর্মীরা আইন পরিপন্থী হলেও পণ্যবাহী গাড়িতে কর্ম এলাকায় ফিরতে বাধ্য হচ্ছেন। রাতের আঁধারে সাধারণ যাত্রীদের একটি অংশ এক জেলা থেকে অন্য জেলায় যাচ্ছেন পণ্যবাহী গাড়িতে। সে কারণে সীমিত আকারে ও স্বাস্থ্যবিধি মেনে গণপরিবহন চালু করা দরকার বলে বিজ্ঞপ্তিতে উল্লেখ করা হয়।

যাত্রী অধিকার সংরক্ষণ পরিষদের সাধারণ সম্পাদক মো. সামসুদ্দীন চৌধুরী বলেন, ‘জীবন যেমন জরুরি তেমনি জীবিকাও দরকার। আর এ দুটোকে সমন্বয় করতে গেলে গণপরিবহন চালু করার কোনো বিকল্প নেই। জীবিকার তাগিদে একটু একটু করে সবই চালু করতে হবে। তবে তা স্বাস্থ্যবিধি মেনে। স্বাস্থ্যবিধি মেনে গণপরিবহনে ৪০ সিটের গাড়িতে দুরত্ব তথা এক আসন ফাঁকা রেখে ২০ সিটে ২০ জন করে যাত্রী বহন করলে ও গাড়িতে ওঠার আগে স্যানিটাইজার দিয়ে হাত পরিষ্কার করার ব্যবস্থা এবং প্রতি ট্রিপ শেষে জীবাণুনাশক স্প্রে দিয়ে গাড়ি পরিষ্কার করলে করোনার সংক্রমণ থেকে যাত্রীদের রক্ষা করা সম্ভব। তাহলে একই সাথে দেশে ৭০ লাখ পরিবহন শ্রমিকও রুটি-রুজির জোগান দিতে পারবে। অন্যথায় এমন লাগাতার বন্ধ হয়ে থাকলে এই বিপুল সংখ্যক শ্রমিক ও তাদের পরিবার ভবিষ্যতে আরো বেশি অনিশ্চয়তার মুখে উপনিত হবে।

সময় নারায়নগঞ্জ.কম এ প্রকাশিত/প্রচারিত সংবাদ, তথ্য, ছবি, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট বিনা অনুমতিতে ব্যবহার বেআইনি।

আপনার মন্তব্য লিখুন:

মহানগর -এর সর্বশেষ